কম গতি ও নিরাপত্তা ঘাটতিতে দস্যুদের কব্জায় এমভি আবদুল্লাহ

কালান্তর ডেস্ক: অপেক্ষাকৃত কম গতি ও নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে সোমালিয়ার জলদস্যুরা বাংলাদেশি পতাকাবাহী এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকরা বলছেন, জলদস্যুরা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ব্যবহার করে জাহাজের সামগ্রিক বিষয়ে নিশ্চিত হয়। পরে ইরানি ফিশিং বোটের সাহায্যে জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জলদস্যুদের কবলে পড়ার আগমুহূর্তে জাহাজটিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ঢাকার অনুমোদন চেয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি টহল জাহাজ। তবে নাবিকদের নিরাপত্তা বিবেচনায় তার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়া এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধারে মধ্যস্থতা শুরু হয়েছে। প্রটেকশন অ্যান্ড ইনডেমনিটি ক্লাব (পিঅ্যান্ডআই) এই মধ্যস্থতা করছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজ এমভি জাহানমণি উদ্ধারেও মধ্যস্থতা করেছিল পিঅ্যান্ডআই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর (ইইউ নেভি) সবশেষ তথ্য বলছে, সোমালিয়ার তিনটি জায়গায় জলদস্যুদের আস্তানা আছে। সোমালিয়া উপকূলের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে আস্তানাগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। সবশেষ হালনাগাদ তথ্যে ইইউ নেভি জানায়, এমভি আবদুল্লাহর পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে এবং ২৩ নাবিকের সবাই নিরাপদে আছেন। ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ‘সবচেয়ে কার্যকর’ পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশ ও সোমালি কর্তৃপক্ষসহ সব অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে অপারেশন আটলান্টা।

সূত্র জানায়, এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি হওয়ার দিন আশপাশে আরও অনেক জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি জাহাজকে কেন টার্গেট করা হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, এমভি আবদুল্লাহর গতি কম ছিল এবং ফ্রি বোর্ড (পানির ওপর থেকে জাহাজের ডেক পর্যন্ত) কম থাকায় সহজে দস্যুরা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে। তিনি জানান, ইরানি মাছ ধরার ট্রলারের থাকা এআইএস প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েই এমভি আবদুল্লাহর গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছে। এআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা জাহাজের যাবতীয় তথ্য জানা সম্ভব। তারা দেখেছে, জাহাজটির গতি কম; আবার পানি থেকে ডেকের দূরত্ব কম। তখনই হাইস্পিড স্পিডবোট নিয়ে আক্রমণে নেমে জাহাজের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতি কম থাকলেও অনেক ট্যাংকার জাহাজে দস্যুরা যেতে পারে না; কারণ এসব জাহাজের ফ্রি বোর্ড বেশি থাকে। সাধারণত ৯ মিটারের বেশি ফ্রি বোর্ড জাহাজে দস্যুরা উঠতে পারে না। এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে ৪ থেকে ৫ মিটার ছিল; ফলে দস্যুরা সহজেই উঠতে পেরেছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাইরিস্ক এরিয়া বা ওয়ার জোনে গেলে বিশেষ নিরাপত্তা নিয়ে যেতে হয়। মালিকপক্ষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এমভি আবদুল্লাহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অনেক দূর দিয়ে যাচ্ছিল। জাহাজে রেজার ওয়্যাল দেখা যায়নি। গতিও কম ছিল। জাহাজ চলাচলের রাস্তা ঠিক করেন ক্যাপ্টেন। পথিমথ্যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে তার ব্যবস্থাও তিনি নিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে কি ঘটেছিল, সেটা জাহাজের নাবিকরা না আসা পর্যন্ত বলা মুশকিল। এই মুহূর্তে জিম্মি নাবিকদের উদ্ধারের বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

এদিকে, রবিবার জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে মালিক প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিং। এর প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম জানান, নাবিকদের সবাই ভালো আছেন। জাহাজটি বর্তমানে সোমালিয়া উপকূলের গদবজিরান শহরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সেখান থেকে আপাতত অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই মুহূর্তে জিম্মি নাবিকদের উদ্ধারে পুরো মনোযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি চট্টগ্রামের কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস (কেএসআরএম) গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন। গত ১২ মার্চ ভারত মহাসাগরে ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটি সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে। মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে জাহাজটি সংযুক্ত আরব-আমিরাতের দুবাইয়ের আল-হামরিয়া বন্দরে যাচ্ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x