রামপালে ভেসে গেছে হাজার হাজার মৎস্য ঘের : ক্ষতি ৫কোটি টাকার ও বেশী

মোঃ হাফিজুর রহমান, রামপাল :
রামপালে ইয়াসের তান্ডবে জীবনহানি কম হলে ও জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে হাজার হাজার মৎস্য ঘের। মেীসুমের শুরুতে ইয়াস আঘাত হানায় চরম ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে রামপালের মৎস্য চাষীরা। রামপালের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য চাষের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় মৌসুমের শুরুতে কেউ ব্যাংক থেকে, কেউ এনজিও থেকে , কেউ বা সারা বছরের কষ্টে সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করে মৎস্য ঘের গুলোতে। মৎস্য ঘেরের আয় থেকে লোন পরিশোধের পাশাপাশি সারা বছরের জীবন জীবিকা চলের এ এলাকার সাধারন মানুষের। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে ইয়াস আঘাত হানায় মৎস্য চাষীরা চরম দিশেহারা। অনেকের মৎস্য ঘের গুলোতে নতুন করে বিনিয়োগের সামর্থ ও নেই। যদি আবার এনজিও বা সরকার থেকে লোন না পায়, তাহলে তাদের পড়তে হতে সুদে কারবারীদেও হাতে। ফলে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে রামপালের মৎস্য চাষীদের মধ্যে।
সরকারী সূত্র মতে, ইয়াসের প্রভাবে প্রবল জোয়ারে রামপালের ১০টি ইউনিয়ন থেকে ছোটবড় মিলে মোট ২৭৮১টি মৎস্য ঘের জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটির ও বেশী টাকা। তবে প্রকৃত ক্ষয় ক্ষতির পরিমান আরো বেশী বলে দাবি স্থানীয় মৎস্য চাষীদের। শুধু ইয়াস নয়, অমাবস্যা, পূর্নিমা বা অধিক বৃষ্টি হলে জোয়ারের পানি প্রবেশের ফলে উপকুলে বসবাসরত মানুষের একাধিকবার এ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল সংলগ্ন খাল খননের মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধের মাধ্যমে তীরবর্তী মানুষের জোয়ারের পানির ক্ষতি থেকে অনেকটা বাচানো যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
রামপাল উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মৎস্য অফিস, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকার সাধারন মানুষ বলছে যে, এবারে ঘূর্নিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জীবনহানী কম ঘটলে ও জীবনে বেচে থাকার অবলম্বন এ এলাকার মৎস্য ঘের গুলো ভেসে গেছে ইয়াসের পানির প্রভাবে। মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, এ ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানিতে ২হাজার ৭শত ৮১টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে যার মোট আয়তন ১হাজার ৪শত ৪৪ হেক্টর। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মোট ৫ কোটি ২৪ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকার। একাধিক স্থানীয় একাধিক সাধারন মানুষ জানিয়েছেন যে, সরকারী হিসেবে মৎস্য ঘের ক্ষতির যে পরিসংখন দেয়া হয়েছে, বাস্তবে ক্ষতির পরিমান আরো অনেক বেশী। শুধু মৎস্য ঘের নয়, একাধিক স্থানে ভেড়ীবাধ ও রাস্তা ভেঙ্গে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে জোয়ারের পানি। নষ্ট হয়ে গেছে অনেক সবজি ক্ষেত। জোয়ারের পানি প্রবেশের ফলে রান্না করার মত পরিস্থিতি নেই অনেক এলাকার মানুষের। শুধুমাত্র ইয়াসের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ নয়, অমাবস্যা, পূর্নিমা বা অধিক বৃষ্টি হলেই রামপালের উপকুলবর্তী অনেক এলাকার মৎস্য ঘের গুলো বছরে একাধিকবার পানিতে ডুবে যেয়ে থাকে। এ অবস্থার সাথে উপকুলীয় এলাকার মানুষ খুবই পরিচিত। প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করার শক্তি করোর নেই সত্যি। তবে মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল খননের ফলে নদী ও খাল তীরবর্তী যে মাটি রাখা হয়েছে, তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিক বৃষ্টি বা প্রবল জোয়ারের পানির ফলে বারাবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পেরে মৎস্য ঘের সহ উপকুলীয় এলকার সাধারন মানুষদের।
স্থানীয় অনেকে জানিয়েছেন যে, মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল সংলগ্ন ৮৩টি খাল খনন করে তার অধিকাংশ মাটি ফেলা হয়েছে নদী ও খালের দুপাশে। কিছু কিছু যায়গায় এ মাটি ফেলে অনেক উচু করা হয়েছে, কিছু যায়গা রয়েছে নিচু। এই উচু নিচু মাটিকে যদি সমান্তরাল করা হয়, তাহলে এটি আপনা আপনি গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধে পরিনত হতে পারে। এ জন্য দরকার শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। সরকার কাবিখা, কাবিটা-এর মত প্রকল্পের মাধ্যমে মোংলা-ঘসিয়াখালী চ্যানেল সংলগ্ন খালের মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ এর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত লোকদের গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধের আওতায় আনলে তারা অনেক ক্ষতি থেকে মুক্তি পেতে পারবে বলে স্থানীয় অনেকে বিশ্বাস করে। নতুবা বছরে একাধিকবার তাদের এ ক্ষতি মোকাবিলা করে জীবন যাপন করতে হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রামপাল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সেখ মোয়াজ্জেম হোসেন’র কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, আমি নিজে পানিবন্দি মানুষের কাছে গিয়েছি, উপজেলার সর্বত্র খোজ খবর নিয়েছি। অসংখ্য মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারী ভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরী করা হচ্ছে। সরকারী বরাদ্দ এলেই প্রকৃত মৎস্য চাষীদের সহায়তা করা হবে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক রাস্তা ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে। আমরা এগুলোকে ও দ্রæত সংস্কারের চেষ্টা করছি। এছাড়া বর্ষার মৌসুমে জোয়ারারে পানির কবল থেকে এলাকার মানুষের বসতবাড়ী ও মৎস্য ঘের যাতে বারবার ডুবে না যায়, নদী ও খাল তীরবর্তী মাটি ব্যবহার করে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ দেয়ার বিষয়টি ও আমরা ভেবে দেখছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x